Sunday, October 16, 2005

মা

এক যুগ পেরিয়ে গেছে মৃণালিনীর মৃত্যুর পর. তার পুরনো জিনিস বাক্স বন্ধ হয়ে পড়ে আছে বাড়ির এক কোনে কোথাও, পুরু ধুলয়ে ঢাকা. মার্কর্সারা নিবীর ভাবে তাকে জড়িয়ে সংসার পেতেছে. কালচে হয়ে যাওয়া একখানি রুপোর ফ্রেম-এ তার হলদেটে ছবি রয়েছে. তাতে নোংরা জমাট বাঁধা সিঁদুরের টিপ.

আজ মৃণালিনীর মৃত্যুদিবস. নিলি মোমবাতি আর ফুল নিয়ে বসে মায়ের ছবির সামনে. মায়ের কোনো স্মৃতীই প্রায় নেই তার. আট বছর বয়েসে সে মা কে হারায়. শোনা গল্পের সাথে কল্পনা মিশিয়ে মাকে একরকম সে ভাববার চেষ্টা করে. কিন্তু মা তার ভিষণ অচেনা. বিয়ের দিন মায়ের গহনা গুলো সে পড়েছিল. মায়ের থেকে আর কি পেয়েছে নীলি? মাকে যে রোগ মৃত্যুর মুখে ঠেলেছিল, রক্তের মধ্যে সেই রোগের বীজ ? তিরিশের আসেপাশে পৌছনো অব্দি মৃত্যু ভয় উঁকিঝুকি দেয় নীলির মনে.

দুষ্টুমি করলে মা ওকে শাস্তি দিতেন একলা ঘরে বন্দী করে . নীলি বন্ধ ঘরে ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদত . অন্লার শাড়িগুলো টেনে মাটিতে ফেলে ওর মধ্যে লুটোপুটি করত . বাবার কাছে মায়ের বিরুধ্যে অনেক নালিশ করবার সংকল্প আঁটতো . বাবা নীলিকে ভিসন ভালবাসতেন . নীলির কোনো আবদার তার কাছে নিরাশ হয়নি কখনো . কান্নাকাটিতে ক্লান্ত হয়ে নীলি শেষে ঘুমিয়ে পড়ত . মা যখন এসে মেয়েকে শাড়ির জট থেকে উদ্ধার করে খাটে শুইয়ে দিতেন , তখন দুহাত দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরত নীলি ঘুমের মধ্যে . মেয়ের মাথায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৃনালিনী ওর ভবিষ্যতের কথা ভাবতেন . নিজে ডাক্তার ছিলেন . নীলির পড়াশোনা নিজে সম্পূর্ণ দেখতেন . ওকে সঞ্চয়িতা থেকে কবিতা শেখাতেন , সঙ্গীতের তালিম দিতেন . নীলির সব ব্যাপারে তার সতর্কতাপূর্ণ নজর থাকত . নীলিকে কত যত্ন করে মানুষ করবেন স্বপ্ন দেখতেন মৃনালিনী . মায়ের জীবনের দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে হুহু করে ওঠে নীলির মন .

মৃনালিনী যাবার সময় গিরিশের জীবনের অর্ধেকটা সঙ্গে নিয়ে গেলেন . নীলির চোখে জল ভরে আসে ওর বাবার কথা ভেবে . নীলি তখন কতটুকুইবা বুঝত ! তবু বুঝত গিরিশ যেন নিজেকে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন শুধুই তার মুখের দিকে চেয়ে . কাজে মন নেই , নিজের শরীরের দিকে মন নেই , সংসারে মন নেই . চারিপাশের বসন্ত বিষাক্ত তার কাছে . বাবার সাথে সাথে সব সময় থাকবার চেষ্টা করত নীলি . তাকে শাশন করত , অপটু হাতে তাকে সেবা করত সাধ্য মতন . তিন বছর বাদে বাবাও চলে গেলেন cerebral stroke এ .

নীলির ঘাঁড়ে মাথা গুঁজে অরুনাভ জিগ্গেস করল, "কি গো , খাবে না তুমি ?" দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে আসতে আসতে ফু দিয়ে মোমবাতি নিবিয়ে উঠে পড়ল নীলি মায়ের ছবির সামনে থেকে .

Followers